মহাকাব্য কাকে বলে? বাংলা মহাকাব্যের বৈশিষ্ট্য ও শ্রেণিবিভাজন দেখাও।

মহাকাব্য কাকে বলে? মহাকাব্যের বৈশিষ্ট্য ও শ্রেণিবিভাজন দেখাও।

 

বাংলা সাহিত্যের প্রাচীন ও মধ্যযুগের সাহিত্য ছিল কবিতা নির্ভর। তারপর আধুনিক যুগে পাশ্চাত্য সাহিত্যের প্রভাবে বাংলা সাহিত্যে মহাকাব্যের প্রচলন হয়। উনিশ শতকে বাঙালির জাতীয় জীবনে যে নব জাগরণের সৃষ্টি হয় তা মহাকাব্যের আঙ্গিক ও বিষয়ে দেখা যায়। স্বদেশপ্রেম ও জাতীয়তাবোধ চেতনা মহাকাব্য রচনার পেছনে প্রবহমান ছিল। সাধারণত বীর রসাত্মক আখ্যানকাব্যকে মহাকাব্য বলা হয়। মহাকাব্যের কাহিনি স্বর্গ, মর্ত্য ও পাতাল পর্যন্ত বিস্তার লাভ করে। মহাকাব্যকে দুই ভাগে ভাগ করা যায়। যেমন জাত মহাকাব্য ও সাহিত্যিক মহাকাব্য। ‘রামায়ণ’, ‘মহাভারত’, ইলিয়াড’, ‘ওডিসি’ জাত মহাকাব্য। অপরদিকে ‘প্যারাডাইস লস্ট’, ‘মেঘনাদবধ কাব্য’ সাহিত্যিক মহাকাব্যের উদাহরণ। প্রশ্নের চাহিদা অনুসারে নি¤েœ বাংলা মহাকাব্যের বৈশিষ্ট্য ও শ্রেণিবিভাজন সম্পর্কে আলোচনা করা হলো-

বাংলা মহাকাব্যের বৈশিষ্ট্য :

মহাকাব্যের প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য আদর্শ এবং অলংকারিকদের মতামত বিশ্লেষণ করে বাংলা মহাকাব্যের নিম্নলিখিত বৈশিষ্ট্য পাওয়া যায়।
১. মহাকাব্যের কাহিনি হবে কোন পৌরাণিক বা ঐতিহাসিক ঘটনা।
২. মহাকাব্যের সর্গ বিভাজন থাকবে, কমপক্ষে আটটি ও সর্বাধিক ত্রিশটি সর্গ থাকবে।
৩. একটি সর্গের সবটুকু একই ছন্দে রচিত হবে, তবে অন্য সর্গ আলাদা ছন্দে রচিত হতে পারে।
৪. আরম্ভ হবে আশীর্বাদ বা নমস্কার দিয়ে।
৫. মহাকাব্যের কাহিনি স্বর্গ-মর্ত্য ও পাতাল পর্যন্ত বিস্তার লাভ করবে।
৬. শৃঙ্গার রস, বীর রস, শান্ত রস এর যে কোন একটি রস মহাকাব্যের প্রধান রস হবে আর অন্যগুলো অপ্রধান রস হিসেবে থাকবে।
৭. মহাকাব্যে যুদ্ধ, প্রকৃতি, নগর ও সমুদ্রের বর্ণনা থাকবে।
৮. ভাষা হতে তেজস্বী ও গাম্ভীর্যপূর্ণ।
৯. অলংকারও রসভাব সম্বলিত হবে।
১০. নায়ক দেবতা না হলেও অসাধারণ ক্ষমতাসম্পন্ন হবে এবং উচ্চবংশের সন্তান হবে অথবা ক্ষত্রিয় বংশের সন্তান।
১১. বর্ণনার মধ্যে আদি, মধ্য ও অন্তের মধ্যে সমন্বয় থাকবে।
১২. বিষয় অনুযায়ী সর্গের নামকরণ হবে।
বাংলা মহাকাব্যের শ্রেণিবিভাজন :

মহাকাব্য দুই প্রকার : নিচে উদাহরণসহ মহাকাব্যের শ্রেণিবিভাজন আলোচনা কর।

১. জাত মহাকাব্য : এ ধরনের মহাকাব্য কোন একক ব্যক্তির রচনা নয়। বহু কবি ও মানুষের অবদান এখানে একত্রিত থাকে। তবে কোন একজন কবি এ কাব্য সমাপ্ত করেন এবং তিনিই এর রচয়িতার মর্যাদা লাভ করেন। এ কাব্যে যুগে যুগে কোন দেশের সর্বসাধারণের জীবন, সমাজ ও সংস্কৃতি এবং মূল্যবোধ উপস্থাপিত হয়ে থাকে। এ কাব্য বহুদিন ধরে মানুষের মুখে মুখে গীত ও পঠিত হয়। এ মহাকাব্য গোটা দেশ ও জাতীর হৃদয়ে স্থাপিত হয়। কোন প্রচলিত জাতীয় কাহিনির মধ্য দিয়ে এ কাব্য প্রকাশ লাভ করে। সংস্কৃত ভাষার দুটি বিখ্যাত মহাকাব্য ‘রামায়ণ’ ও ‘মহাভারত’ জাত মহাকাব্য হিসেবে আমাদের নিকট বেশ পরিচিত। ‘রামায়ণ’ মহাকাব্যটি সম্পন্ন করেছেন আদি কবি বাল্মীকি আর ‘মহাভারত’ মহাকাব্যটি সম্পন্ন করেছেন ব্যাস। গ্রিক দেশের মহা কবি হোমারের ‘ইলিয়াড’ ও ‘ওডিসি’ নামে দুটি জাত মহাকাব্য রয়েছে।

২. সাহিত্যিক মহাকাব্য : এ ধরনের মহাকাব্য অলংকার বিধি সম্মত রচনা। এ গুলো পরবর্তীকালের সৃষ্টি। জাত মহাকাব্যের মতো এগুলো এতো বিশাল আকারের নয়; তবে এর কাহিনি সুসংহত ও শিল্পিত বিন্যাসে সাজানো থাকে। এ কাব্যের একটি বিশেষ বিশেষত্ব হলো শিল্পনৈপুণ্য। কবির মানসপ্রকৃতি ও যুগের আকাঙ্খা এতে প্রতফলিত থাকে। কবি সমকালের সাথে সর্বকালের সংযোগ ঘটাতে পারেন। জীবনজিজ্ঞাসা এতে বাণীরুপ লাভ করে। এ মহাকাব্য মানুষের মুখে মুখে পঠিত হওয়ার সুযোগ থাকে না। খ্রিস্টপূর্ব প্রথম শতকে লেখা ভার্জিলের ‘ঈনিড’, ইংরেজ কবি জন মিলটনের ‘প্যারাডাইস লস্ট’ সাহিত্যিক মহাকাব্য। বাংলা ভাষার প্রাণপুরুষ মাইকেল মধুসূদন দত্ত ‘মেঘনাদ বধ’ নামে একটি সাহিত্যিক মহাকাব্য রচনা করেছেন। এই কাব্য ১৮৬১ সালে প্রকাশ হয়। বাংলা ভাষার একমাত্র সফল ও সার্থক সাহিত্যিক মহাকাব্য।

উপর্যুক্ত বিষয়ের আলোচনা-পর্যালোচনার মাধ্যমে দেখা যায় যে, মহাকাব্য বলতে অতিকায় কবিকৃর্তিকে বোঝায়। সাহিত্যে দুই প্রকারের মহাকাব্য রয়েছে। জাত মহাকাব্য ও সাহিত্যিক মহাকাব্য । মহাকাব্যে কোন জাতির সামাজিক, রাজনেতিক, সাংস্কৃতিক জীবনের প্রতিফলন ঘটে। প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য মহাকাব্যের আদর্শের সংমিশ্রণে বাংলা ভাষায় মহাকাব্য সৃষ্টি হয়েছে। এ ক্ষেত্রে মাইকেল মধুসূদন দত্ত মহাকাব্য রচনায় শতভাগ সফলতার পরিচয় দিয়েছেন এবং বাংলা সাহিত্যে অমর হয়ে আছেন।

সালেক শিবলু, এমফিল গবেষক, বাংলা বিভাগ, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়, গাজীপুর ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *