বাংলা মহাকাব্যের উদ্ভব ও বিকাশ ধারা বর্ণনা কর।

বাংলা মহাকাব্যের উদ্ভব ও বিকাশ ধারা বর্ণনা কর।

বাংলা সাহিত্যের প্রাচীন ও মধ্যযুগের সাহিত্য ছিল কবিতা নির্ভর। তারপর আধুনিক যুগে পাশ্চাত্য সাহিত্যের প্রভাবে বাংলা সাহিত্যে মহাকাব্যের প্রচলন হয়। উনিশ শতকে বাঙালির জাতীয় জীবনে যে নব জাগরণের সৃষ্টি হয় তা মহাকাব্যের আঙ্গিক ও বিষয়ে দেখা যায়। স্বদেশপ্রেম ও জাতীয়তাবোধ চেতনা মহাকাব্য রচনার পেছনে প্রবহমান ছিল। সাধারণত বীর রসাত্মক আখ্যানকাব্যকে মহাকাব্য বলা হয়। মহাকাব্যের কাহিনি স্বর্গ, মর্ত্য ও পাতাল পর্যন্ত বিস্তার লাভ করে। মহাকাব্যকে দুই ভাগে ভাগ করা যায়। যেমন জাত মহাকাব্য ও সাহিত্যিক মহাকাব্য। ‘রামায়ণ’, ‘মহাভারত’, ইলিয়াড’, ‘ওডিসি’ জাত মহাকাব্য। অপরদিকে ‘প্যারাডাইস লস্ট’, ‘মেঘনাদবধ কাব্য’ সাহিত্যিক মহাকাব্যের উদাহরণ। প্রশ্নের চাহিদা অনুসারে নিম্নে বাংলা মহাকাব্যের বিকাশধারা আলোচনা করা হলো-

বাংলা মহাকাব্যের ক্রমবিকাশে যারা গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন ধারাবাহিকভাবে তাঁদের সাহিত্যকর্ম নিম্নে উপস্থাপন করা হলো-

১. মাইকেল মধুসূদন দত্ত :

মাইকেল মধুসূদন দত্ত বাংলা সাহিত্যে আধুনিকতার প্রবর্তক। এ জন্য তাকে নবজাগরণের কবি বলা হয়। তিনি বাংলা এবং ইংরেজি দুই ভাষায় কাব্য রচনা করেছেন। প্রথমে ইংরেজিতে দুটি মহাকাব্য রচনা করেছেন। এ গুলো হলো ‘দি ক্যাপটিভ লেডি’ ও ‘ভিসন অব দ্যা পাস্ট’। ১৮৬১ সালে প্রকাশিত হয় ‘মেঘনাদ বধ’ নামক মহাকাব্য। এটি বাংলা মহাকব্য ধারায় এক যুগান্তকারী ঘটনা। এটি বাংলা প্রথম সফল ও সার্থক মহাকাব্য। এটি একটি সাহিত্যিক মহাকাব্য। মাইকেল মধুসূদন দত্ত এ মহাকাব্যের কাহিনি ‘রামায়ণ’ থেকে গ্রহণ করেছেন। নয়টি সর্গে রচিত এটি একটি বীর রসাত্মক মহাকাব্য। পুত্র শোকে কাতর রাবণের হাহাকার দিয়ে মহাকাব্যের শুরু আবার রাবণের বিলাপের মধ্য দিয়ে এ মহাকাব্য সমাপ্ত হয়েছে। লেখক রাবণকে এ মকহাকাব্যের নায়ক চরিত্রের মর্যাদা দিয়েছেন। রাবণ, মেঘনাদ, বীরবাহু, প্রমিলা, চিত্রাঙ্গদা, মন্দোদরী, বিভীষণ, সূর্পণখা, রাম, লক্ষণ, সীতা, সরমা এ মহাকাব্যের উল্লেখযোগ্য চরিত্র। বাংলা কাব্য সাহিত্যে যতগুলো সাহিত্যিক মহাকাব্য রয়েছে তন্মধ্যে ‘মেঘনাদবধ কাব্য’ সবচেয়ে সফল ও শ্রেষ্ঠ মহাকাব্য। মাইকেল মধুসূদন দত্ত অমিত্রাক্ষর ছন্দে এ মহাকাব্য রচনা করেছেন। এই একটি কাব্য তাঁকে বাংলা কাব্যসাহিত্যে চিরদিন স্মরণীয় করে রাখবে।

২. রঙ্গলাল বন্দ্যোপাধ্যায় :

আধুনিক বাংলা কাব্যাঙ্গনে রঙ্গলাল বন্দ্যোপাধ্যায় নামটি বিশেষভাবে স্মরণীয়। ইংরেজি ও পাশ্চাত্য শিক্ষায় শিক্ষিত হওয়ায় তাঁর কাব্যে আধুনিকতার স্পর্শ লেগেছে। তবে তিনি সর্বাংশে আধুনিক হয়ে উঠতে পারেন নি। তাকে ‘বয়সন্ধির বার্তাবহ’ হিসেবে অভিহিত করা হয়। তিনি রাজপুতদের অতীতের গৌরব কাহিনি অবলম্বনে ‘পদ্মিনী উপাখ্যান’ রচনা করেছেন। এ কাব্যে তিনি পাঠকের মনে দেশাত্ববোধ জাগ্রত করতে চেয়েছেন। কবি রঙ্গলালের দ্বিতীয় কাব্য ‘কর্মদেবী’। এটিও রাজপুত ইতিহাসের কাহিনি অবলম্বনে রচিত হয়েছে। তাঁর তৃতীয় কাব্যগ্রন্থ ‘শূর-সুন্দরী’। এটিও রাজুপতদের কাহিনি নিয়ে রচিত হয়েছে। তাঁর চতুর্থ কাব্যগ্রন্থ হলো ‘কাঞ্চীকাবেরী’। এ কাব্যে ধর্মমূলক কাহিনি স্থান পেয়েছে। দেশপ্রেমমূলক কাব্য রচনায় তিনি আমাদের নিকট স্মরণীয় হয়ে থাকবেন। এখানে একটি কবিতার কয়েকটি চরণ উল্লেখ করতে চাই-

স্বাধীনতা-হীনতায় কে বাঁচিতে চায় হে,
কে বাঁচিতে চায় ?
দাসত্ব শৃঙ্খল বল কে পরিবে পায় হে,
কে পরিবে পায়।

৩. হেমচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় :

মহাকাব্য রচনায় হেমচন্দ্র মাইকেল মধুসূদন দত্তকে অনুসরণ করেছেন। তিনি পৌরাণিক কাহিনি অবলম্বনে কাব্য রচনা করেছেন এবং বাঙালিদের মধ্যে হিন্দু জাতীয়তাবোধ জাগ্রত করবার চেষ্টা করেছেন। ‘বৃত্রসংহার’ তাঁর বিখ্যাত মহাকাব্য। এ কাব্যের দুটি খ- আছে। বৃত্ত নামে এক অসুর স্বর্গ জয় করে। দেবতাদের রাজা ইন্দ্র অসুর বধ করে আবার স্বর্গে অধিকার ফিরে পায়-এই কাহিনি অবলম্বনে ‘বৃত্রসংহার’ মহাকাব্যের কাহিনি গড়ে উঠেছে। মধুসূদন দত্ত এর ‘মেঘনাদবধ কাব্য’এ জীবনবোধের যে বিকাশ ঘটেছে, ‘বৃত্রসংহার’ কাব্যে সেভাবে জীবনবোধের বিকাশ ঘটেনি। তবে হেমচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় ‘চিন্তাতরঙ্গিণী’ কাব্যের মাধ্যমে খ্যাতি লাভ করেছেন এবং বাংলা মহাকাব্যের ধারায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন।

৪. নবীনচন্দ্র সেন :

নবীনচন্দ্র সেন বৈচিত্র্যময় প্রতিভার অধিকারী। নবীনচন্দ্র সেন বাংলা মহাকাব্য রচনায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন। তিনিও হেমচন্দ্রের ন্যায় বাঙালিকে হিন্দু জাতীয়তাবাদী চেতনায় জাগ্রত করার চেষ্টা করেছেন। নবীনচন্দ্র সেন ‘রৈবতক’, ‘কুরুক্ষেত্র’, ও ‘প্রভাস’ নামে তিনটি মহাকাব্য রচনা করেছেন। এই তিনটি কাব্যকে একত্রে ‘ত্রয়ীকাব্য’ নামে অভিহিত করা হয়। নবীনচন্দ্র সেন এই ত্রযীকাব্যের কাহিনি সংগ্রহ করেছেন ‘মহাভারত’, ‘ভাগবত’, ‘বিষ্ণুপুরাণ’ প্রভৃতি কৃষ্ণলীলা বিষয়ক কাব্য থেকে। তিনটিকাব্যের কাহিনিগত বিষয় বিবেচনা করে এটিকে ‘উনবিংশ শতাব্দীর মহাভারত’ নামে আখ্যায়িত করা হয়। এই ত্রয়ীকাব্যের মাধ্যমে তিনি বাংলা মহাকাব্যে স্মরণীয় হয়ে আছেন।

৫. কায়কোবাদ :

কায়কোবাদের মুল নাম কাজেম আল কোরায়শী। কায়কোবাদ তাঁর সাহিত্যিক ছদ্মনাম। ‘মহাশশ্মান’ (১৯০৪) মহাকাব্য রচনা করে তিনি বাংলা সাহিত্যে মহাকবির মর্যাদা লাভ করেছেন। এটি তিন খ-ে বিভক্ত, প্রথম খ-ে ১৯টি, ২য় খ-ে ২৪টি, এবং তয় খ-ে ৭টি সর্গ রয়েছে। ১৭৬১ সালে সংঘটিত পানি পথের তয় যুদ্ধ নিয়ে এ কাব্যের কাহিনি সৃষ্টি হয়েছে। এই যুদ্ধ দুই পক্ষ থাকে। যুদ্ধ শেষে দুই পক্ষই প্রচুর ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এ জন্য কায়কোবাদ এ কাব্যের নাম রেখেছেন ‘মহাশশ্মান’। এটি বাংলা মহাকাব্যের ধারায় অনন্য সংযোজন। তাছাড়া বাংলা সাহিত্যে আরো কিছু মহাকাব্য রচিত হয়েছে যেমন : ইসমাইল হোসেন সিরাজীর ‘স্পেন বিজয়’, ‘মহাশিক্ষা’, হামেদ আলীর ‘কাশেম বধ’, ‘জয়নাল উদ্ধার’, ‘সোহরাব বধ’, যোগীন্দ্রনাথ বসুর ‘পৃথ্বীরাজ’, ‘শিবাজী’ প্রভৃতি গ্রন্থ সফল মহাকাব্য না হলেও মহাকাব্যের ধারাকে বিকশিত করেছে।

উপর্যুক্ত বিষয়ের আলোচনা-পর্যালোচনার মাধমে দেখা যায় যে, বাংলা মহাকাব্যের ধারা মাইকেল মধুসূদন দত্ত এর হাতে সূত্রপাত হয়। এর পর একে একে অনেক কবি-সাহিত্যিকগণ এ কাব্য ধারায় অবদান রেখেছেন। তবে সবাই কাব্যের কাহিনির মধ্য দিয়ে স্বদেশ প্রেমকে জাগ্রত করবার চেষ্টা করেছেন। সবাই মহাকাব্য রচনায় একইভাবে সফলতা পান নি। তবে সব লেখকদের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় এ কাব্যধারা গড়ে উঠেছে। সার্বিক বিচার-বিবেচনায় দেখা যায় যে, এ কাব্যধারায় মাইকেল মধুসূদন দত্তের অবদান সর্বাধিক।

সালেক শিবলু, এমফিল গবেষক, বাংলা বিভাগ, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়, গাজীপুর ।

Scroll to Top