মঙ্গলকাব্য কী? মধ্যযুগের মঙ্গলকাব্যের ধারার সংক্ষিপ্ত পরিচয় দাও।

মঙ্গলকাব্য কী? মধ্যযুগের মঙ্গলকাব্যের ধারার সংক্ষিপ্ত পরিচয় দাও।

মঙ্গলকাব্য মধ্যযুগের বাংলা সাাহিত্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ ও প্রধান ধারা। দেব দেবীর মাহাত্ম্যলীলা ও পুজা প্রচারের কাাহিনি এতে স্থান পেয়েছে। মঙ্গল শব্দটির সাথে শুভ ও কল্যাণের বিষয়টি জড়িত রয়েছে। বৈশিষ্ট্যের বিচারে মঙ্গল কাব্যগুলোকে পৌরাাণিক ও লৌকিক-এই দুই শ্রেণিতে বিভক্ত করা যায়। প্রশ্নানুসারে মঙ্গলকাব্য ধারার সংক্ষিপ্ত পরিচয় তুলে ধরা হল :

মনসামঙ্গল কাব্য : মঙ্গলকাব্যের মধ্যে ‘মনসামঙ্গল’ সবচেয়ে প্রাচীন কাব্য। মনসামঙ্গল কাব্যের অধিষ্ঠাত্রী দেবীর নাম মনসা বা কেতকী। তাই এ কাব্যকে মনসামঙ্গল কাব্য বলে। এ কাব্যকে পদ্মপুরাণও বলা হয়। এ কাব্যের প্রধান প্রধান কবি হলেন-দ্বিজ বংশীদাস, কেতকাদাস, নারায়ণ দেব, বিপ্রদাস পিপিলাই ও বিজয়গুপ্ত। এ কাব্যের আাদি কবির নাম কানাহরিদত্ত। বিজয়গুপ্ত রচিত মনসামঙ্গল কাব্য পদ্মপুরাণ নামে ১৩০৩ খ্রিস্টাব্দে প্রথম ছাপার অক্ষরে প্রকাাশিত হয়। এ কাব্যটি ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করেছিল। কবি বিপ্রদাস পিপিলাই রচিত ‘মনসামঙ্গল’ কাব্যের নাম ‘মনসাাবিজয়’। কাব্যের কাাহিনি নির্মাণ ও চরিত্র চিত্রণে বিপ্রদাস বিশেষ কৃতিত্বের পরিচয় দিয়েছেন। ‘মনসামঙ্গল’ কাব্যের গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র হলো মনসা, চাঁদ সওদাগর, মা সনকা, বেহুলা ও লখিন্দর।

চণ্ডীমঙ্গল কাব্য : দেবী চণ্ডীকে নিয়ে ‘চণ্ডীমঙ্গল’ কাব্যের কাহিনি গড়ে উঠেছে। এ কাব্যে দেবী চণ্ডীর পুজা প্রচারের পাশাপাাশি কালকেতু ফুল্লরার জীবনের উত্থান ও সুখ-দুঃখের কাাহিনি ফুটে উঠেছে। চণ্ডীমঙ্গল কাব্যের কাাহিনি দুই খণ্ডে বিভক্ত। একটি আক্ষেটিক খণ্ড, অর্থাৎ ব্যাধ কালকেতুর গল্প, আরেকটি বণিক খণ্ড অর্থাৎ ধনপতির গল্প। চণ্ডীমঙ্গল কাব্যের কবিগণ হলেন-মাানিকদত্ত, দ্বিজ মাধব, মুকুন্দ্ররাম চক্রবর্তী, দ্বিজ রামদেব, মুক্তারাম সেন, হরিণাম, জয়নারায়ণসেন প্রমুখ। কাাহিনি নির্মাণ, চরিত্র চিত্রণ ও ভাষা বর্ণনায় কবি মুকুন্দ্ররাম চক্রবর্তী বিশেষ কৃতিত্বের পরিচয় দিয়েছেন। এ কাব্যের গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র হলো কালকেতু, ফুললরা, পুষ্পকেতু, সঞ্জয়কেতু, ভাড়–দত্ত, মুরারীশীল পোতদ্দার ইত্যাাদি। ভাড়–দত্ত এ কাব্যের সবচেয়ে জীবন্ত ও প্রাণবন্ত চরিত্র। এ রকম চরিত্র মঙ্গলকাব্যে খুব কম আছে।

ধর্মমঙ্গল কাব্য : ধর্মমঙ্গল কাব্যে ধর্মঠাকুর নামে এক লৌকিক দেবতার পুজা প্রচারের কাাহিনি স্থান পেয়েছে। ডোম জাতীয় লোকেরা এ ঠাকুরের পুজা করে। ধর্মমঙ্গল কাব্যের দুটি কাাহিনি আছে। একটি রাজা হরিশচন্দ্রের কাাহিনি, আরেকটি রাজা লাউসেনের কাাহিনি। এ কাব্যের আাদি কবি ময়ুর ভট্ট। শ্রেষ্ঠ কবি ঘনরাম চক্রবর্তী।
দুর্গামঙ্গল কাব্য : চণ্ডীদেবীর কাাহিনির কথাই দুর্গামঙ্গল ভবানীমঙ্গল কাব্যে বিধৃত হয়েছে। এ কাব্যের উল্লেখযোগ্য কবি হলেন-দ্বিজকমল, লোচন ও ভবানীপ্রসাদ রায়।

কাালিকামঙ্গল কাব্য : কাালিকা দেবীর মহিমার কথা এ কাব্যে স্থান পেয়েছে। নামে কাালিকামঙ্গল হলেও এ কাব্যে বিদ্যা ও সুন্দরের রোমাান্টিক প্রেমের কাাহিনি অধিক গুরুত্ব পেয়েছে। কাালিকামঙ্গল কাব্যের কবিরা হলেন-সাবাারিদ খাঁ, কৃষ্ণরাম দাস, বলরাম চক্রবর্তী ও ভারতচন্দ্র রায়গুণাকর। ভারতচন্দ্র রায়গুণাকর এ কাব্যের শ্রেষ্ঠ কবি। তাঁর কাব্যের নাম ‘অন্নদামঙ্গল’ কাব্য। অন্নদামঙ্গল কাব্য বাংলা সাাহিত্যের সর্বশেষ মঙ্গলকাব্য। এরপরে আর কোন মঙ্গলকাব্য রচিত হয় নি। কবি ভারতচন্দ্র এ কাব্য রচনার কারণে বাংলা সাাহিত্যে অমর হয়ে আছেন। তিনি নবদ্বীপের রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের কাছ থেকে রায়গুণাকর উপাাধি পেয়েছেন। ‘মানসিংহ ভবানন্দ উপাখ্যান’ এ কাব্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। স¤্রাট জাহাঙ্গীর, প্রতাপদিত্য, সেনাপতি মানসিংহ, ভবানন্দ মজুমদার, চন্দ্রমুখী, পদ্মমুখী এ কাব্যের গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র। এভাবে বিভিন্ন কবির হাতে অনেক কাব্য রচিত হয়েছে এবং মঙ্গলকাব্যের ধারা সমৃদ্ধ হয়েছে।

ধর্মীয় বাতাবরণে দেবদেবীর মাহাত্ম্যকীর্তন এ সব কাব্যের প্রধান বৈশিষ্ট্য হলেও এতে স্থান পেয়েছে মানবজীবন ও সমাজের নিত্য দিনের অনেক খুঁটিনাাটি চিত্র। মুকুন্দ্ররাম চক্রবর্তী ও ভারতচন্দ্রের মত শক্তিমান লেখকেরা মঙ্গলকাব্যের ধারাকে শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছেন। এদের কবি প্রতিভার গুণে আমরা মঙ্গলকাব্যের মধ্যে পেয়েছি চাঁদ সওদাগর, কালকেতু, ফুল্লরা,ও ভাড়–দত্ত প্রভৃতির মত জীবন্ত মানবচরিত্র। সবদিক বিচারে মঙ্গলকাব্যগুলো অতুলনীয় ও মধ্যযুগের বাংলা সাাহিত্যের গুরুত্বপূর্ণ শাখা।

সালেক শিবলু, এমফিল গবেষক, বাংলা বিভাগ, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়, গাজীপুর।

Scroll to Top