ইন্দো-ইউরোপীয় মূল ভাষা থেকে বাংলা ভাষা পর্যন্ত কালানুক্রমিক ধারা আলোচনা কর। 211003

বাংলা ভাষা পর্যন্ত কালানুক্রমিক ধারা
ইন্দো-ইউরোপীয় মূল ভাষা থেকে বাংলা ভাষা পর্যন্ত কালানুক্রমিক ধারা আলোচনা কর। (ক্রম ধারা/বিবর্তনধারা)

পৃথিবীর যাবতীয় ভাষাকে এর ৈেবশিষ্ট্য ও বুৎপত্তির দিক থেকে লক্ষ্য রেখে অনেক ভাষাগ্রুপে ভাগ করা যায়। এদেরকে ভাষাগোষ্ঠী বলে। এ সব ভাষাগোষ্ঠীর মধ্যে সবচেয়ে সমৃদ্ধ ও উল্লেখযোগ্য ভাষাগোষ্ঠী হলো ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষাগোষ্ঠী। আমাদের মাতৃভাষা বাংলার উৎপত্তি ও ক্রমবিকাশ এই ইন্দো-ইউরোপীয় মূল ভাষাগোষ্ঠী থেকে। প্রশ্নানুসারে এখন বাংলা ভাষার উৎপত্তি ও কালানুক্রমিক ধারা আলোচনা করা হলো-

খ্রিস্টপূর্ব প্রায় আড়াই হাজার বছর পূর্বে মধ্য এশিয়ায় একটি জনগোষ্ঠী প্রথম মূল ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষা ব্যবহার করেছিল। পরবর্তীতে জনসংখ্যা বৃদ্ধির ফলে তারা ইউরোপ ও এশিয়ায় বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে। পাকিস্তানের উত্তর পশ্চিম সীমান্ত দিয়ে ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষা গোষ্ঠীর একটি দল ভারতে প্রবেশ করে। এই জনগোষ্ঠীর ভাষা আর্য নামে পরিচিত। আর্য ভাষার আবার তিনটি শাখা। ইরানিয়, দারদিয় ও ভারতীয়। ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষাগোষ্ঠীর একটি দল ইরান ও মধ্য এশিয়ায় বসবাস শুরূ করে। পরবর্তী সময়ে ভারতীয় ও ইরানিয় ভাষাগোষ্ঠীর সমন্বয়ে ইন্দো-ইরানিয় ভাষাগোষ্ঠীর সৃষ্টি হয়। ইন্দো-ইরানিয় ভাষার নিদর্শন প্রাচীন ঋকবেদে পাওয়া যায়।

আর্যরা আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব ১৫০০ অব্দে থেকে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র দলে বিভক্ত হয়ে ভারতবর্ষে বসবাস শুরু করে। ধীরে ধীরে সমগ্র ভারতবর্ষে ছড়িয়ে পড়ে এবং অনার্য অধিবাসীদের স্থানীয় ভাষার উপর প্রভাব বিস্তার শুরু করে। এই আর্যদের ভাষার নাম প্রাচীন ভারতীয় আর্যভাষা। এর এক অংশের নাম বৈদিক ভাষা। বৈদিক ভাষা সংস্কার করে নাম রাখা হয় সংস্কৃত। সংস্কৃত ভাষা অভিজাত শ্রেণির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকল। বৈদিক ভাষা ক্রমে সরলীকৃত হতে হতে জন্ম হলো সাধারণ মানুষের ব্যবহারযোগ্য প্রাকৃত ভাষার। অঞ্চলভেদে এই প্রাকৃত ভাষার আবার নানা রূপ ও নাম দেখা যায়। এসব প্রাকৃত ভাষা হলো-অর্ধমাগধী প্রাকৃত, মাগধী প্রাকৃত, মহারাষ্ট্রী প্রাকৃত, শৌরসেনী প্রাকৃত, গৌড়ীয় প্রাকৃত প্রভৃতি। কালক্রমে এ মাগধী প্রাকৃত এর অপভ্রংশ থেকে বিবর্তন ও পরিবর্তনের মাধ্যমে বাংলা ভাষার উৎপত্তি ঘটে।

ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষার উচ্চারণ বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী একে শতম ও কেন্তুম এই দুই শাখায ভাগ করা হয়েছে। শতম শাখায় অন্যতম ধারা ইন্দো-ইরানিয়। মূল ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষার যে শাখাটি ভারববর্ষ ও ইরানে প্রবেশ করে, সে শাখাটি হলো ইন্দো-ইরানিয়। এই ইন্দো-ইরানিয় শাখার যে উপশাখা ভারতবর্ষে প্রবেশ করে তাকেই ভারতীয় আর্য বলে। আবার ভারতীয় আর্য ভাষাকে তিনটি ভাগে ভাগ করা যায়।

ক. প্রাচীন ভারতীয় আর্য: ১৫০০ খ্রি.পূ.-৬০০খ্রি.পূ. পর্যন্ত
খ. মধ্য ভারতীয় আর্য: ৬০০ খ্রি.পূ.-৯০০খ্রি. পর্যন্ত
গ. নব্য ভারতয়ি আর্য: ৯০০খ্রি.-বর্তমান পর্যন্ত।
ঘ. সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় ‘ইন্দো-ইউরোপীয়’ মূল ভাষা থেকে আধুনিক বাংলা পর্যন্ত স্তরগুলোর ক্রমধারা নিম্নরূপে অনুমান করেছেন।
ঙ. ইন্দো-ইউরোপীয়, আনুমানিক ২৫০০ খ্রি.পূ.
চ. ইন্দো-ইরানিয়, আনুমানিক ১৮০০খ্রি.পূ.
ছ. প্রাচীন ভারতীয় আর্য, আনুমানিক ১২০০ খ্রি.পূ.
জ. মধ্যভারতীয় আর্য, আনুমানিক ৭০০ খ্রি.পূ.
ঝ. মগধের মধ্যভারতীয় আর্য ভাষার আদি স্তর, আনুমানিক ৩০০খ্রি.পূ.
ঞ. মগধের পরিবর্তনশীল মধ্যভারতীয় আর্যশাখা, খ্রিস্টাব্দের প্রায় সমকালীন।
ট. মগধের মধ্যভারতীয় আর্যভাষার দ্বিতীয় স্তর, আনুমানিক ৩০০ খ্রি.
ঠ. মগধ অপভ্রংশ, আনুমানিক ৮০০খ্রি.
ড. প্রাচীন বাংলা, আনুমানিক ১১০০খ্রি.
ঢ. আদি মধ্য বাংলা, আনুমানিক ১৪০০ খ্রি.
ণ. অর্বাচীন মধ্য বাংলা, আনুমানিক ১৬০০খ্রি.
ত. আধুনিক বাংলা, ১৮০০ খ্রিস্টাব্দের পর।

ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ সুনীতিকুমারের কালনির্ণয় মেনে নেননি। তিনি ‘বাঙলা ভাষার ইতিবৃত্ত’ নামক গ্রন্থে ভারতীয় আর্যভাষাকে তিনটি স্তরে ভাগ করেছেন যা নিম্নরূপ:

১. আদিম স্তর : প্রাচীন ভারতীয় আর্য এবং আদিম প্রাকৃত, সময়কাল: ১২০০-৫০০খ্রি.পূ. পর্যন্ত
২. মধ্য স্তর : ৫০০ খ্রি.পূ. থেকে ৬৫০ খ্রি.পর্যন্ত, নাটকীয় প্রাকৃত অপভ্রংশ বস্তুত সমকালীন।
৩. আধুনিক স্তর : ভারতীয় আর্য ভাষাগুলোর প্রাচীনরূপ ৬৫০ খ্রি. হতে বর্তমানকাল পর্যন্ত।

বাংলা ভাষার প্রাচীনরূপ পরিবর্তন করে মধ্য বাংলায় পরিণত হয়, এই মধ্যবাংলা হতে আধুনিক বাংলার উৎপত্তি। মধ্যযুগকে গবেষকেরা আবার তিনটি ভাগে ভাগ করেছেন। এগুলো নিম্নরূপ:

অ.অন্তবর্তী যুগ : ১২০১ থেকে ১৩৫০ খ্রি. পর্যন্ত বাংলা ভাষায় তেমন কোন সাহিত্যকর্ম পাওয়া যায় নি। কোন কোন গবেষক একে অন্ধকার যুগ বা সন্ধিকাল বলে উল্লেখ করেছেন।

আ.আদিমধ্যযুগ : ১৩৫১ তেকে ১৫০০ পর্যন্ত এই সময়কাল আদিমধ্যযুগ। শ্রীকৃষ্ণকীর্তন, শ্রীকৃষ্ণবিজয় ও মনসামঙ্গল এ সময়ের সাহিত্যিক নিদর্শন।

ই.অন্ত্যমধ্যযুগ : ১৫০১ থেকে ১৮০০ পর্যন্ত মধ্যযুগের শেষ স্তর। রোমান্টিক প্রণয়োপাখ্যান, বৈষ্ণব পদাবলি ও মঙ্গলকাব্য এ সময়ের ভাষার নিদর্শন।

কালের ধারাবাহিকতা ও ভাষার বৈশিষ্ট্য পর্যবেক্ষণ করে বর্তমান সময়ের প-িতেরা প্রাচীন বাংলা থেকে আধুনিককাল পর্যন্ত সময়কে সর্বমোট তিনটি স্তরে ভাগ করেছেন, যা নিম্নরূপ:

১. প্রাচীন বাংলা : ৬৫০ থেকে ১২০০ খ্রি. পর্যন্ত
২. মধ্যযুগ : ১২০১ থেকে ১৮০০ খ্রি. পর্যন্ত ও
৩. আধুনিকযুগ : ১৮০১ খ্রি. থেকে বর্তমান পর্যন্ত।

উপর্যুক্ত আলোচনা, পর্যালোচনা ও বিশ্লেষণের মাধ্যমে দেখা যায় যে, বাংলা ভাষার ক্রমবিকাশের ধারা ও বিবর্তনে ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ এর মতামত অধিক যুক্তিযুক্তি ও গ্রহণযোগ্য।

সালেক শিবলু, এমফিল গবেষক, বাংলা বিভাগ, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়, গাজীপুর ।

ইন্দো-ইউরোপীয় মূল ভাষা থেকে বাংলা ভাষা পর্যন্ত কালানুক্রমিক ধারা আলোচনা কর।