কাব্যধর্মী উপন্যাস হিসেবে বিষাদ সিন্ধুর সফলতা আলোচনা করো । 211003

কাব্যধর্মী উপন্যাস হিসেবে বিষাদ সিন্ধুর সফলতা আলোচনা করো ।

মীর মশাররফ হোসেন (১৮৪৭-১৯১২) বাংলা সাহিত্যের আধুনিক যুগের প্রথম উল্লেখযোগ্য মুসলিম সাহিত্যিক। তাঁর রচনাসম্ভার অত্যন্ত সমৃদ্ধ। ‘বিষাদসিন্ধু’ তাঁর কালজয়ী সাহিত্যকর্ম। কারবালার বিষাদময় কাহিনি অবলম্বনে এ উপন্যাসজাতীয় গ্রন্থ রচিত। গ্রন্থটি ইতিহাস, উপন্যাস, সৃষ্টিধর্মী রচনা ও নাটক ইত্যাদি সাহিত্যের বিবিধ সংমিশ্রণে রোমান্টিক আবেগমাখানো কালজয়ী সাহিত্যকর্ম। এর ভাষা কাব্যধর্মী। বিষাদ সিন্ধু উপন্যাসের ভাষা সম্পর্কে নিম্নে আলোচনা করা হলো-

বিষাদ সিন্ধুর সফলতা নির্ভর করে কতগুলো বিষয়ের উপর, যেমন কাহিনির পটভূমি, ঘটনার উপস্থাপনারীতি, চরিত্র, সংলাপ, সর্বোপরি গ্রন্থটির ভাষাবৈশিষ্ট্যের উপর। ‘বিষাদ সিন্ধু’ উপন্যাসের শ্রেষ্ঠ সম্পদ এর ভাষাশৈলি। মীর মশাররফ হোসেন বাংলা সাহিত্যে ঔপন্যাসিক হিসেবেই সমধিক পরিচিত। কিন্তু তাঁর অমর গ্রন্থ ‘বিষাদ সিন্ধু’ উপন্যাসের ভাষা অত্যন্ত বাস্তবসম্মত ও সেই সাথে কাব্যধর্মী। তাঁর উপন্যাসের ভাষার মধ্যে কবিতার রস আস্বাদন করা যায়। তিনি সাধু ভাষায় গ্রন্থটি রচনা করেছেন। তৎসম শব্দের ব্যবহার বেশি। তাছাড়া তদ্ভব, দেশি, বিদেশি, আরবি, ফারসি শব্দের সফল প্রয়োগ দেখতে পাওয়া যায়। পাঠকের কাছে অত্যন্ত জনপ্রিয় গ্রন্থ হিসেবে পঠিত হচ্ছে যুগ যুগ ধরে। এর কারণ এ গ্রন্থের ভাষায় এক ধরণের মাদকতা আছে যা পাঠককে সব সময় মুগ্ধ করে রাখে।

‘বিষাদসিন্ধু’র শ্রেষ্ঠসম্পদ এর ভাষা। এ গ্রন্থের ভাষায় সংগীতধর্মীতা রয়েছে, অন্তর্লীন সংগীত প্রবাহে গ্রন্থটিকে বহুলাংশে কাব্যসৌন্দর্য প্রদান করেছে। কাব্যে দোতনা, আবেগের স্পন্দন, ধ্বনির ব্যঞ্জনা আর অলংকারের প্রাচৃর্য, বিষাদসিন্ধু গ্রন্থে এক ধরণের শ্রি ও কান্তি এনে দিয়েছে। তাছাড়া লেখকের অনুভূতি ও আন্তরিকতার অন্তহীন। সমস্ত কৃত্রিমতা পরিহার করে ভাষা সহজ, সুঠাম ছন্দের লালিত্য ও গতিভঙ্গি লাভ করেছে। নি¤েœ একটি দৃষ্টান্ত উল্লেখ করছি-

ঈশ্বরের মহিমার অন্ত নাই। একটি সামান্য বৃক্ষপত্রে তাহার শত সহ¯্র মহিমা প্রকাশ পাইতেছে। একটি পতঙ্গের ক্ষুদ্র পালকে তাঁহার অনন্ত শিল্পকার্য বিভাসিত হইতেছে। অনন্ত বালুকারাশির একটি ক্ষুদ্র বালুকণাতে তাঁহার অনন্ত করুণা আঁকা রহিয়াছে। তুমি আমি সে করুণা হয়তো জানিতে পারিতেছি না; কিন্তু তাঁহার লীলাখেলার মাধুর্য, কীর্তিকলাপের বৈচিত্র্য, বিশ্বরঙ্গভূমির বিশ্ব-ক্রীড়া একবার পর্যালোচনা করিলে ক্ষুদ্র মানববুদ্ধি বিচেতন হয়। (মহররম পর্ব-২৩)

সম্বোধন করে কথা বলা মীর মশাররফ হোসেনের গদ্যশৈলির একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য। মীর মশাররফ হোসের একজন শ্রেষ্ঠ ভাষাশিল্পী। তিনি অত্যন্ত আন্তরিকতা ও সচেতনতার সঙ্গে ভাষার শৈল্পিক প্রয়োগ ঘটিয়েছেন। তিনি সব সময় পাঠককে কাহিনির সঙ্গে নিয়ে যান। পাঠক যাতে কোন কিছু ভুলে না যায়, সে জন্য তিনি পুনরায় ঘটনাটি স্মরণ করিয়ে দেন। আবার কখনো কখনো পাঠককে সমোবাধন করে ঘটনা বর্ণনা করেন এবং পাঠকের সাথে সরাসরি সংযোগ স্থাপন করেন। এখানে এ রকম একটি উদাহরণ উল্লেখ করছি –

‘পাঠক, শুনন-ডঙ্কা! তুরী ভেরীর বাদ্য! শুনিতেছেন! জয়ধ্বনির দিকে মন দিয়েছেন?’
‘বিষাদসিন্ধু’ উপন্যাসের ভাষা চিত্রময়। কাহিনি বর্ণনার মাঝে মাঝে তিনি চিত্রকলার মায়াবী সৌধ নির্মাণ করেছেন। লেখকের বর্ণনা কৌশল অসাধারণ। এখানে কয়েকটি দৃষ্টান্ত উল্লেখ করছি।

ক. যে সূর্য সখিনার বিবাহ দেখিল, সে সূর্যই সখিনার বৈধব্যদশা দেখিয়া চলিল।
খ. কাসেমের পরিহিত শুভ্রবসন লোহিতবর্ণে রঞ্জিত হইয়াছে, শোণিতধারা অশ্বপদ বহিয়া পড়িতেছে।
মীর মশাররফ হোসের উপমা, রূপকের নতুন প্রয়োগে এ গ্রন্থে নতুন মাত্রা সংযুক্ত করেছেন। উপমা, রূপক, উৎপেক্ষার শৈল্পিক প্রয়োগে ভাষা গতিশীলতা পেয়েছে, বিষয় স্পষ্ট হয়েছে, পাঠকের কাছে এক বিশেষ আবেদ তৈরি করেছে। যেমন :
ক. সখিনা নব অনুরাগে পরিণয়সূত্রে তোমারই প্রণয় পুষ্পহার কাসেম আজ গলায় পরিয়াছিল। (মহররম পর্ব-২৫)
খ. জয়নবের হৃদয়ের ধন, অমূল্যনিধি, সুখপুষ্পের আশালতা, সেই হাসান তো আর বাহ্যজগতে জীবিত নাই। (মহররম পর্ব-১৯)

মীর মশাররফের ভাষারীতিতে সচেতন ভাষাশিল্পীর পরিচয় খুঁজে পাই। কল্পনা এবং ভাষা, ভাষা এবং ঘটনার বিন্যাস এক অপরের পরিপূরক এবং এক ধরণের কাব্যিক সমন্বয়ে ভাষার মধ্যে গতিশীলতা স্বতন্ত্র মাত্রা লাভ করেছে। চরিত্র নির্মাণ, শব্দ নির্বাচন, কাহিনি উপস্থাপনা, সর্বোপরি ভাষার শৈল্পিক প্রয়োগে ‘বিষাদসিন্ধু’ কাব্যধর্মী উপন্যাস হিসেবে সফলতা লাভ করেছে।

উপর্যুক্ত আলোচনা পর্যালোচনা মাধ্যমে এ কথা নিঃসন্দেহে বলা যায় যে, বিষাদসিন্ধু’ উপন্যাসের শ্রেষ্ঠ সম্পদ এর ভাষা। ভাষার কাব্যধর্মিতা ও গতিশীলতার জন্য এ গ্রন্থ একটি কালজয়ী সাহিত্যকর্মে পরিণত হয়েছে এবং যুগ যুগ ধরে পাঠকের তৃপ্তি সাধন করছে।

সালেক শিবলু, এমফিল গবেষক, বাংলা বিভাগ, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়, গাজীপুর

এই প্রশ্নটি পরীক্ষায় নানা ভাবে আসতে পারে যেমন-

‘বিষাদ সিন্ধুর শ্রেষ্ঠ সম্পদ এর ভাষা’ আলোচনা কর। ( ভাষাশৈলি / ভাষাবৈশিষ্ট্য / ভাষাবিষয়ক প্রবন্ধ / কাব্যধর্মী উপন্যাস হিসেবে সফলতা)